বুধবার, ৭ মার্চ, ২০১২

বুয়েটে প্রথম দিন

৯ জুন, ২০০৭ । সুদীর্ঘ ৬ মাস অপেক্ষার পর অবশেষে বুয়েটে আমাদের ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে । প্রথম ক্লাসঃ পদার্থবিজ্ঞান ল্যাব, সকাল ৮ টায় । প্রথম তিন পিরিয়ড নিয়ে ল্যাব । রুটিনে সেটা এমনভাবে লেখা ছিল যে দেখে অনেকেই সকাল ৯টা ভেবেছিল । আমি নিজেও ভেবেছিলাম । কিন্তু ক্লাস শুরুর আগের দিন জয় ফোন করে জানায় যে ল্যাব আসলে ৮টায় । তার অবশ্য সি.এস.ই ল্যাব ছিল । সে যাই হোক, ক্লাস শুরুর দিন উত্তেজনার আতিশয্যেই হোক, কিংবা উত্তরা থেকে এতদূর আসার কারনেই হোক, সকাল ৭.১৫ এর দিকেই ক্যাম্পাসে উপস্থিত হলাম । ই.এম.ই বিল্ডিং এর সামনে এসে একটা পরিচিত মুখ দেখলাম । নটর ডেম কলেজের গ্রুপমেট রকিব, সি.এস.ই তে ভর্তি হয়েছে । রকিবের পাশে আরেকজন সুদর্শন ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম । গিয়ে পরিচিত হলাম ছেলেটির সঙ্গে । ছেলেটি নিজেকে আজহারুল ইসলাম সনেট নামে পরিচয় দিল । আরও জানতে পারলাম যে সে আমার ক্লাসমেট । ঐখানে আরও একজন ছেলে ছিল, এই মুহূর্তে তার নাম মনে করতে পারছি না ।

আমরা এই চারজন গল্প করতে করতে বুয়েটের প্রধান ফটকের সামনে এসে অবস্থান নিলাম । এর মধ্যে দেখি ডেয়ারিং চেহারার একটা মেয়ে গেট দিয়ে ঢুকে ডানে বাঁয়ে না তাকিয়ে গটগট করে সোজা ই.এম.ই বিল্ডিং এর দিকে চলে গেল । মেয়েটিকে নির্দেশ করে রকিব আমাকে জিজ্ঞেস করলঃ

  • - দোস্ত, মেয়েটাকে চিনিস?
  • - নাহ ।
  • - কি বলিস!!! ও কে চিনিস না !!! অ্যাডমিশন টেস্টে দশম হয়েছে । চরম ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী ।
  • - সেজন্যই বুঝি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল?
  • - মনে হয়। ওমেকার প্রসপেক্টাসেও ওর ছবি দেখিস নাই?
  • - দেখছি হয়তো, খেয়াল করিনি ভালভাবে ।

মনে মনে কিছুটা শঙ্কিত হলাম, এইসব চরম ব্রিলিয়ান্ট সুপার ইগোদের সাথে বছর চারেক ক্লাস করতে হবে এই ভেবে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭.৪৫ বেজে গেছে । আমাদের ল্যাবে যাওয়ার সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। আমি আর সনেট পদার্থবিদ্যা ল্যাব অভিমুখে যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু ১৫ মিনিট ধরে খোজাখুজি করেও ল্যাব আর খুজে পাই না। ও.এ.বির ভিতরে ঢুকে মনে হচ্ছিল যেন মধ্যযুগীয় কোন দুর্গে প্রবেশ করেছি। অবশেষে কয়েকজনের সহায়তায় দুর্গম গিরি কান্তার মরু পার হয়ে ফিজিক্স ল্যাবে প্রবেশ করলাম প্রায় ৫ মিনিট দেরিতে। ভেবেছিলাম ঢুকেই টিচারের ঝাড়ি খাব, কিন্তু সেরকম কিছু ঘটেনি । বরং ল্যাবে মাত্র ৩/৪ জনকে দেখতে পেলাম। এর মধ্যে একজন হচ্ছে হিজ হাইনেস তন্ময় কুমার ভৌমিক! কলেজে থাকতে যাকে সামনে দিয়ে যেতে দেখলেই সসম্মানে যায়গা ছেড়ে দিতাম । তন্ময়কে দেখে সুপার-ইগো জনিত শঙ্কাটা আরেকটু ঘনীভূত হল। সনেটকে দেখলাম সে তন্ময়ের পাশে বসে গল্প শুরু করে দিয়েছে। বুঝলাম যে তন্ময়ের সাথে তার ভালই খাতির আছে। এটা দেখে সনেটের প্রতিও সমীহ জেগে উঠল। আমি তাদের সাথে না বসে একটু ভয়ে ভয়ে পাশের টেবিলে বসলাম।

একজন স্যার এবং একজন ম্যাডামকে দেখলাম সামনে চেয়ারে বসে আছেন । তাঁরা নিজেদের যথাক্রমে ডঃ জীবন পোদ্দার এবং মিসেস ফাহিমা খানম নামে পরিচয় দিলেন। তাঁদের অমায়িক ব্যবহার দেখে বেশ ভাল লাগল। তাঁরা একে একে ল্যাবের বিভিন্ন নিয়ম কানুন বলে যেতে লাগলেন। প্রথমেই ঘোষণা করলেন যে তিনজন করে গ্রুপ করতে হবে, আর গ্রুপিং হবে নিজেদের ইচ্ছামত। তন্ময় আর সনেট একসাথে গ্রুপ করবে, আরেকজন দরকার। সনেট আমাকে জিজ্ঞেস করল ওদের সাথে গ্রুপ করব কি না। প্রথমে একটু দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, তন্ময়ের মত বস মানুষের সাথে গ্রুপ করা ঠিক হবে কিনা । পরে ভাবলাম, যা আছে কপালে, এই ভেবে সনেটের কথায় রাজি হয়ে গেলাম।

ম্যাডাম আমাদেরকে কিভাবে রিপোর্ট লিখতে হবে সে বিষয়ে তালিম দিচ্ছিলেন । এ-ফোর কাগজে রিপোর্ট দিতে হবে। রিপোর্টের ফরম্যাট নিয়েও অনেক কথা বললেন । এরপর কারও কোন প্রশ্ন আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন । তন্ময় কুমার ভৌমিক তার প্রশ্নবাণ নিয়ে উঠে দাঁড়াল।

  • - ম্যাডাম, রিপোর্ট কি কাগজের দুই পাশেই লিখব নাকি এক পাশে লিখব?
  • - দুই পাশেই লিখ। শুধু শুধু কাগজের অপচয় করার কি দরকার
  • - ম্যাডাম, কাগজে কি মার্জিন করব?
  • - কর । মার্জিন করলে তো দেখতে ভালই লাগে।
  • - মার্জিন কি শুধু লেফট সাইডে করব নাকি রাইট সাইডেও করতে হবে? তাছাড়া মার্জিনের ডাইমেনশনই বা কি হবে? কত ইঞ্চি করে?
  • - তোমার ইচ্ছামত কর। দেখতে ভাল হলেই হবে।

আশেপাশে দুয়েকজনকে দেখলাম মুখ টিপে হাসছে। তন্ময়ের অবশ্য দোষ নাই, নটরডেম কলেজের ফিজিক্স ল্যাব করে এই অবস্থা হয়েছে। যেখানে মার্জিনের ডাইমেনশন পর্যন্ত পারলে ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা হত আর মাইক্রোমিটার রেঞ্জে এদিক সেদিক হলেও মেক-আপ (রিপিট) দিয়ে দিত।

তন্ময়ের প্রশ্নবাণ শেষ হলে জীবন পোদ্দার স্যার ল্যাবের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলেন। এটা বলেও সাবধান করে দিলেন যে কোন যন্ত্র নষ্ট করলে সেটার ক্ষতিপূরণও দিতে হবে!!!

ফিজিক্স ল্যাবের পরবর্তী ক্লাস ছিল ক্যালকুলাস-১ । আমি ক্লাসে ঢুকে সেকেন্ড বেঞ্চে বসলাম। আমার পাশে বসেছিল অর্ক। ওর সাথে ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের পরপরই পরিচয় হয়েছিল। আস্তে আস্তে সবাই ক্লাসে এসে বসল । আমার পাশের বেঞ্চে বসেছিল নাদিম চৌধুরী । ওর সাথেও রেজাল্টের পর পরই পরিচয় হয়েছিল । কে যেন নাদিমকে দেখিয়ে বলল যে ওর নাকি ১-১ এর সিলেবাস অলরেডি কমপ্লিট!!! কিছুক্ষন পর মেয়েরা ঢুকে প্রথম বেঞ্চে বসল। আমার ঠিক সামনেই বসেছিল লিজেন্ডারি রাফাতুল ফারিয়া ওরফে ম্যাথ-রাণী, যার ছবি পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যেত, গণিত অলিম্পিয়াডের কল্যাণেশুধু পত্রিকায় নয়, বুয়েটের স্বাস্থ্য পরীক্ষার দিন স্বয়ং সৌমিত্র রায় জয়ের মুখেও হার হাইনেস ফারিয়ার ভূয়সী প্রশংসা শুনেছিলাম। এমন একজন গণিতবিদের পাশে(পিছনে) বসে গণিত ক্লাস করছি, এটা ভেবেই আমি শিহরিত হলাম। কিছুক্ষণ পর স্যার ক্লাসে ঢুকে নিজের নাম(ফরহাদ) বলেই পড়ানো শুরু করলেন। অর্ক আমাকে দেখাল স্যার কি যেন একটা ভুল লিখেছেন। ওকে বললাম স্যারকে বলতে, কিন্তু ও সাহস পেল না।

পরের ক্লাস ছিল সার্কিট ক্লাস । আমার পেছনে দেখলাম ফর্সামতো একটা ছেলের (জুবায়ের আল আজিম) হাতে মোটা একটা বই, লেখকের নাম নিলসন। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম এই বই থেকে নাকি টার্ম ফাইনালে অংক আসে । কিছুক্ষণ পর স্যার ঢুকে নিজের নাম(ডঃ জাহাঙ্গীর আলম) বলে, আমাদের হাতে একটা সিলেবাস ধরিয়ে দিয়ে রোল কল করেই চলে গেলেন। সেটাই ছিল সেদিনকার মত আমাদের শেষ ক্লাস।

মঙ্গলবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

নূরুল হুদা একদা হিমুকে নিয়ে নাটক বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলো-০২

০১.
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হিমুর গল্পটা কীরকম হবে?
তা কী কেবল হিমুকেন্দ্রিক হবে না আরো কোন প্রভাবশালী চরিত্র থাকবে আশেপাশে?

জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে শুভ্র সাহেবের আগমন। আমি আর সনেট---দু'জন মিলেই ঠিক করলাম, হিমু আর শুভ্র দু'জনকে বেইস করেই গল্পটা এগোবে। এর আগে হুমায়ূন আহমেদ কোন এক বইয়ে হিমু আর মিসির আলীর সাক্ষাৎ করিয়েছেন। আশ্চর্য হলেও সত্য, হিমু আর শুভ্রর এখন পর্যন্ত কোথাও কখনো দেখা হয়নি। সুতরাং, আমরাই এই গুরুদায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসি না কেনো?

গল্পটা খুব আহামরি গোছের কিছু নয়। শুভ্র খুব ব্রিলিয়ান্ট, কিন্তু বাইরের প্‌থিবীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটা ছেলে। একদম হুমায়ূন আহমেদের শুভ্র'র মতই। একমাত্র রিমি (হু.আ.র গল্পে ছিল মীরা) সাথেই তার কিছুটা জমে। রিমি শুভ্রকে ভয়াবহ পছন্দ করে। যদিও কেউ কাউকে মুখ  ফুটে কখনোই কিছু বলে না। ঘটনাচক্রে শুভ্র এবং পরবর্তীতে শুভ্র'র মারফত রিমির সাথে হিমুর পরিচয় ঘটে। হিমু তার স্বভাবসুলভ সিক্সথ সেন্স দিয়ে দু'জনকেই কনভিন্স করে ফেলে। রিমি যদিও হিমুকে শুরুর দিকে একদম পাত্তা দিচ্ছিলো না। সেই রিমি-ই হিমুর কেরামতিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে একটা বিশেষ এ্যাসাইনমেন্ট দেয়।

এ্যাসাইনমেন্টটা খুব সিম্পল। হিমু শুভ্রকে বাইরের কঠিন প্‌থিবীর সাথে পরিচয় ঘটাবে। এইজন্য যা যা করার দরকার, হিমু ঠিক তাই করবে। হিমু একটু গাঁইগুঁই করলেও এ্যাসাইনমেন্টটা নিতে রাজি হয়।

০২.
এই গল্পের মূল সমস্যা, গল্পের ফিনিশিং খুবই প্রেডিক্টেবল। শেষমেশ শুভ্র বাংলা ছিঃনেমার নায়কের মত খুবই স্মার্ট (হিমুর চেয়ে না অবশ্যই) হয়ে যাবে। আর হিমু আপাতদ্‌ষ্টিতে অর্থহীন দার্শনিক কিছু কথাবার্তা কপচাতে কপচাতে রাতভর জ্যোৎস্নার মধ্য দিয়ে পর্দার অন্তরালে চলে যাবে। শুভ্র আর রিমির মধ্যে কিছু হল কিনা, সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। এরই মধ্যে ফুফা, রুপা, রুপার বাবা---এদের নিয়ে অল্পস্বল্প মজা তো থাকছেই।

গল্পের এই দুর্বলতা সত্ত্বেও আমরা হিমু আর শুভ্রকে নিয়েই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের বিশ্বাস ছিল, হিমুকে নিয়ে যাই বানাই না কেনো, আমরা অন্তত কাজ করে মজা পাবো। আর দর্শকও জিনিসটা খাবে ভালো। বুয়েট অডিয়েন্স অন্তত র‍্যাগ কালচারালে এই ধরণের কাজ দেকেহ অভ্যস্ত না।

এই খবর ক্যাম্পাসে ছড়াতে দেরি হয় না। অডিয়েন্স রেসপন্সও শুনলাম যথেষ্ট পজিটিভ। হিমুর বই লোকে এখন আর পছন্দ করুক বা না-ই করুক, হিমুকে বড় পর্দায় দেখার একটা উত্তেজনা সবার মধ্যেই কাজ করে।

এরই মধ্যে 'হিমু' আর 'শুভ্র' কে ফাইনাল করা হয়। রিমিকে নিয়ে খুব একটা টেনশন ছিল না। চটপটে আর স্মার্ট কেউ হলেই হল। চেহারা মেরিলিন মনরো বা ক্যাটরিনা কাইফের মত হতে হবে---এমন কোন শর্ত লেখা ছিল না ক্যারেক্টারের কোথাও। গোল বাধলো 'রুপা' কে নিয়ে।

গল্পে যদিও রুপার কোন প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু 'হিমুর নাটক' বলে কথা। রুপা না থাকলে ক্যাম্নে কী? হিমুর ফ্লেভারটাই তো মাইরি নষ্ট হয়ে যাবে। একটা-দুটা দ্‌শ্যের জন্য হলেও তাই রুপাকে আনা জরুরী। কিন্তু রুপা বলতে আমরা যে স্নিগ্ধ, মায়াকাড়া কাউকে কল্পনা করি, আমাদের ব্যাচমেটদের মধ্যে তো দূরের কথা, গোটা ক্যাম্পাসেই আমরা এমন কাউকে খুঁজে পেলাম না।

রুপাকে সুন্দরী হতে হবে, কিন্তু অবশ্যই 'খাইসে টাইপ সুন্দরী' না। উদাহরণ? প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ওরফে পিগি চপস। রুপার সৌন্দর্য সম্পূর্ণ আলাদা ধাঁচের। সেই সৌন্দর্যে একটা অপেক্ষা মেশানো থাকবে; ওর মুখাবয়ব হবে নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক। এই ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করা নেহাতই অসম্ভব নয়। সমস্যাটা অন্য জায়গায়। যিনি এই ক্রাইটেরিয়াগুলো ফুলফিল করবেন, তিনি হয়তো অভিনয়েই রাজি হবেন না। বলবেন, "আমার বয়ফ্রেন্ড খুবই ইসলামিক মাইন্ডেড" কিংবা "আমার ফ্যামিলি আমাকে এইসব নাটক-ফাটক করতে দেবে না"। আর যারা এই ক্রাইটেরিয়াগুলো থেকে শত হস্ত দূরে অবস্থান করছে, তারাই হয়তো "ভাইয়া, আপনি যদি বলেন, আমার কোন আপত্তি নেই" বলে সামান্য লজ্জা পাবার ইমো দেবে।

দুনিয়া জুড়া পচুর প্যারাডক্স।

০৩.
এর আগেও আমরা ডিপার্টমেন্টের দুটো নাটকে কাজ করেছিলাম। কিন্তু, কখনোই ব্যাকগ্রাউন্ড ওয়ার্কের প্রয়োজন অনুভব করিনি। সত্যি বলতে কী, দুটো কাজই আমরা অনেকটা ভাই-বেরাদর স্টাইলে করেছি। স্ক্রিপ্ট একটা কিছু থাকতো বা থাকতো না। সিকোয়েন্সটা সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া হত। তারপর বলতে গেলে 'আল্লাহর নামে' অভিনেতাদের ছেড়ে দেয়া হত।

এবার ঠিক করলাম, ভার্সিটি লাইফে শেষ কাজ যেহেতু, একটু প্রফেশন্যালী কাজ করতে হবে। হিমুর নাটকে তো আর এইসব ফারুকীপনা চলবে না। একটা হার্ডকোর স্ক্রিপ্ট এবার না হলেই নয়। কিন্তু, তার জন্যে যে বিস্তর পড়াশোনা প্রয়োজন।

যেই ভাবা সেই কাজ। বন্ধুবান্ধব ও জুনিয়রদের কাছ থেকে হিমুর যতো বই পেলাম, সব হস্তগত করলাম নিমেষে। হিমুর বইগুলো---যেগুলো এককালে পড়েছিলাম এবং যেগুলো তখনো পড়িনি, দেদারসে গেলা শুরু করলাম। এতে কি আমার স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ খুব সহজ হয়ে গিয়েছিলো? মোটেও না। তাহলে? তাহলে কেনো হিমুর অতশত লেখা পড়ে কালক্ষেপণ করা? উত্তরটা খুব সহজ। হিমুর প্রতি এক ধরণের 'অনুভব' তৈরি করা। স্ক্রিপ্ট লেখার সময় হিমুকে যেন কখনোই খুব দূরের কেউ মনে না হয়।

এবং আমি আমার অভিনেতা-অভিনেত্রী সবাইকে বার বার হিমুর বইগুলো পড়তে বলেছি। আমরা তো আর পেশাদার অভিনয় কর্মী নই যে ৯টা-৫টা অফিসের মত করে অভিনয় করছি। আমরা হচ্ছি নেশাদার অভিনেতা এবং নির্মাতা। আমি তাই মনেপ্রাণে চাইবো, আমার যে বন্ধুটা হিমুর ক্যারেক্টার করছে, সে সারাক্ষণ হিমুর মধ্যে ডুবে থাকুক। যে রূপবতী বান্ধবীটি রুপার চরিত্র করছে, তাকে যেন 'রুপা' বলে চিনে নিতে দর্শকের এতোটুকু দেরী হয় না। এমনকি যে জুনিয়রটি বাদলের ভূমিকায় দুটো মাত্র দ্‌শ্যে হাজিরা দিচ্ছে, তাকে দেখে যেন বছরখানেক পর তার জুনিয়ররা আঙুল তুলে বলে, "ঐ দ্যাখ দ্যাখ, বাদল ভাই যাচ্ছে।"

এখানে একটা মজার ব্যাপার লক্ষ করেছি, মেয়েদের মধ্যে হিমুর প্রতি এক ধরণের বিত্‌ষ্ণা আছে। কথাটা মোটাদাগে বলে ফেললাম। তবে, আমার ধারণা, কথাটা মিথ্যে নয়। ছেলেরা অনেকেই হিমুর মধ্যে কখনো না কখনো নিজেকে খুঁজে পায়। কিন্তু, রুপার মধ্যে এমন কোন আকর্ষণী শক্তি নেই, যা পাঠিকাদের আক্‌ষ্ট করতে পারে। ইন জেনারেল, মেয়েদের পছন্দ তাই জয়িতা আর দীপাবলীর স্রষ্টা সমরেশ মজুমদার।

০৪.

এইবার হিমুর স্ক্রিপ্ট প্রসঙ্গে আসি।
স্ক্রিপ্ট লেখার দায়িত্ব আমি আর সনেট ভাগাভাগি করে নিই। গোটা গল্পটা দু'জনের মাথায়ই ছিল। কাজেই, সিনক্রোনাইজ করতে খুব একটা সমস্যা হয়নি। আমি হয়তো একটা সিকোয়ন্স লিখে ওকে মেইল করলাম, ও-ও একটু মাল-মশলা যোগ করে দিলো। সেই ড্রাফট আমি আবার চেক করার জন্য দু'দিন পরপর মুকুলকে ফরোয়ার্ড করি। মুকুল দেখি ভালোমন্দ কিছু বলে না। ওর লজিক হচ্ছে, এখনই স্ক্রিপ্ট পড়ে ফেললে পরে নাটক দেখার সময় মজাটা থাকবে না।

এইখানে বলে রাখি, একটা ড্রাফট স্ক্রিপ্টে হাজার হাজার ভুল থাকে, আর লক্ষ লক্ষ দুর্বলতা। স্ক্রিপ্ট রি-রাইট করার সময় কিছু কিছু ধরা পড়ে। একটা বড় অংশই 'মিসটেকোমিটার'এ ধরা পড়ে না। নাটক দেখার সময় মনে হয়, এই জায়গায় ওটা হলে ভালো হত, নায়ক বাবাজি এই সংলাপটা না দিলেও পারতো, ঐ দ্‌শ্যের তো কোন জরুরৎ-ই ছিল না, হুদাই নাটকটাকে সামান্য ঝুলিয়ে দিয়েছে। এজন্যই স্ক্রিপ্ট লেখার সময় নিরপেক্ষ পাঠকের ফীডব্যাক পাওয়াটা খুব জরুরী। আপনি যদি আমার বন্ধুস্থানীয় হন, তাহলে আমার অনেক ভুলত্রুটিই আপনার চোখে পড়বে না। ভবিষ্যতে যদি কখনো কোন কাজে হাত দিই, আশা করি কেউ না কেউ তার মূল্যবান সময় নষ্ট করে স্ক্রিপ্টের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেবে।

যাহোক, স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ হল। যদিও স্ক্রিপ্ট নিয়ে আমি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম না। খুব বড় কোন টুইস্ট ছিল না গল্পে। সংলাপও খুব আহামরি মানের কিছু ছিল না। অনেক ক্ষেত্রেই সংলাপে বিটিভি'র নাটকের ধাঁচ চলে এসেছিলো নিজের অজান্তে। একটা উদাহরণ দিচ্ছি। পটভূমিটা এরকম, হিমুকে তার এক ভক্ত ক্যাম্পাসের একটা খবর দিচ্ছেঃ

"জয় নামের এক পোলা আমাগো মামাবাহিনীর এক জুনিয়রের লগে একটু তেড়িবেড়ি করসিলো। তো, ঐ পোলার রুমে গিয়া পোলারে একটু এজুকেশন দিয়া আসলাম। এখন শুনি, এই জয় সেই জয় না, আরেক জয়। পোলার আবার বাপ-মা নাই। এতিম পোলা। ওরে দেখনের মতনও কেউ নাই। শেষে নিজে গিয়া পোলারে হাসপাতালে ভর্তি কইরা দিয়া আসলাম। পোলাডার জন্য খুব খারাপ লাগতেসে, হিমু ভাই।"

লক্ষ করে দেখুন, এইখানে একটা দীর্ঘ সংলাপ ব্যবহ্‌ত হয়েছে। এই সংলাপ ডেলিভারী দিতে সংশ্লিষ্ট অভিনেতার কমসে কম এক মিনিট সময় লাগবে। এই সময়টায় আমি ক্যামেরা অন্য কোথাও ফোকাস করতে পারছি না। স্বাভাবিকভাবেই দর্শক বোর হবে, নাটকটা ঝুলে যাবে।

সংলাপ তাহলে কেমন হওয়া উচিত? আমার মতে, সংলাপ হবে সংক্ষিপ্ত ও ঝাঁঝালো। ইংরেজিতে যাকে বলে 'terse'. দীর্ঘ সংলাপ কী তাহলে আমরা একেবারেই বর্জন করবো? নাহ, তা কেনো হবে? 'ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডস'-এর শুরুতে ব্র্যাড পিট-এর দীর্ঘ বক্ত্‌তার কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। সেরকম কড়া ডায়ালগ লিখতে পারলে এবং আপনার ফ্রেমের পরিসর যদি যথেষ্ট ওয়াইড হয়, দীর্ঘ সংলাপ বরং দর্শককে চুম্বকের মত আটকে রাখবে। সমস্যা হচ্ছে, সবাই তো আর টারান্টিনোর মত উইট আর হিউমার সহযোগে সংলাপ রান্না করতে পারে না। এরকম পাকা শেফ দুনিয়ায় খুব অল্পই আছেন।

সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

Already Seen!!!

চিটাগাঙ এ আজকের রোদ টা খুব বেশিই মনে হচ্ছে । কাজ তেমন নেই হাতে। ক্লাস ছিল মাত্র দুইটা । এরপর মমিন স্যারের সাথে কিছুক্ষণ বসলাম । বাসার উদ্দেশ্যে বের হলাম এরপর । ছাতা জিনিসটা আমার কাছে বহন করতে বেশ অস্বস্তি ই লাগে । আজ মনে হচ্ছে ছাতা নিয়ে না বের হলে এমন রোদে অসুখে পড়বই ।
বাসায় বের হবার পথেই হঠাত মিমের ফোন । “তুমি কোথায়? এক্ষনি বাসায় আস ?”কন্ঠে কেমন যেন ভয় মেশানো আর্তনাদের মতন লাগল । আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কি হয়েছে বল তো” ?মিম এবার রাগত স্বরে, “আগে আসো তো”।
আমি বললাম, “আসছি, আসছি, আমি রওনা হয়েছি তো” ।
বাসায় গিয়ে দেখি ভয়ে জুবুথুবু বিছানায় বসে আছে মিম , পাশেই কাজের মেয়েটা। আমি তো খুব অবাক, কি হইছে বল তো ?
মিমের কথামতে আমার রিডিং রুমে জানালার ধার ঘেষে কোন এক ছেলে নাকি উঠেছিল, চার তলায় আমার রিডিং রুম বরাবর জানালা পর্যন্ত উঠবার একটাই উদ্দেশ্য হতে পারে, তা হল চুরি । মিম নাকি ঘর গোছাতে ঐ রুমের দরজা খোলামাত্র চোর টা কে দেখে চিৎকার করে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে আর ও রুমে ঢুকে নি । আমি বললাম, এ আর এমন কি চোর তো আসতেই পারে । মিম বলল, “আমি চোর কে দেখে ভয় পাই নি, “হঠাত করে মনে হচ্ছে এমন টা আগেও হয়েছে, ঠিক একই ভাবে এ জানালা দিয়ে কেউ উঠেছিল, কিন্তু আমি তো মনে করতে পারছি না” । “ঠিক একই অল্প বয়সী এমন একট ছিচকে চোর কেই কেন যেন মনে হচ্ছে এর আগেও এ জানালা দিয়ে উঠেছে আমি দেখামাত্র পালিয়ে গেছে” ।
আমি বললাম, ধুর , আমরা দেড় মাস হল এ বাসায় এসেছি, আগে হবে কোথা থেকে?আর আদৌ কি হয়েছে ? তুমি বা রুখসানা তো আমাকে জানাও নি । মিম কে দেখলাম খুব বিষণ্ন । “না আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কোথাও একটা ঝামেলা হচ্ছে” ।
আমি বললাম, “রাখো তো । আমাদের আগের বাসাটা ছিল নিচ তলায়, ওখানে আমার তো কোন রিডিং রুম ই ছিল না , এমন হবে কি করে বল ? বাদ দাও, খুব খিদে পেয়েছে , খেতে দাও তো” ।
রাতে আমি ল্যাবের টেস্ট নেয়া খাতাগুলো চেক করে ঘুমাতে আসলাম । দেখি মিম নেই বেড রুমে । বারান্দায় উকি দিয়ে দেখলাম , মাথায় হাত দিয়ে চপচাপ বসে আছে ।
“তোমার শরীর খারাপ করল না তো” ?
“না, আমি ঠিক ই আছি, তোমার কাজ শেষ” ?
আমি বললাম, “হুম,কিন্তু তুমি এভাবে একা বসে আছ যে?বারান্দায় রাতে তো আমাকে না ডেকে বস না?”
“আমার ভাল লাগছে না । আজ ঐ ঘটনা টার পর থেকে কেমন যেন লাগছে , “খালি মনে হচ্ছে কোথায় যেন কি একটা ঘটেছে আগে, কিন্তু স্পষ্ট কিছু মনে করতে পারছি না”
আমি বললাম।, “ আরে ধুর, ঐটা নিয়ে এখনো পরে আছ ?”
“শোন, এরকম আমার আগেও হইছে,আমি বলি নাই, এবার যখন শেরপুর থেকে ফিরলাম, স্টেশনে যে তুমি আসার আগেই বাস ছেড়ে দিচ্ছিল, আমি চিৎকার করলাম, আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল এরকম আগেও হয়েছে । ইদানিং যে কি হয়েছে বুঝতে পারছি না, আমার ধারণা আমার কিছু একটা হয়েছে, খুব ভয় লাগে যখন একা থাকি ।”
আমি হেসে বল্লাম,”মিম এটাকে বলে “ডেজাভু (Déjà vu )”...এর বেশি কিছুই না ।
“ডেজাভু কি জিনিস?”
এটা একটা ফ্রেঞ্চ ওয়ার্ড। এর মানে হল কোন কিছু আগেই দেখা হয়ে গেছে বা জানা আছে (already seen before) ।
মিম আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালো।
আমি ওর হাতটা কোলে তুলে পাশে বসলাম,
“শোন, এটা খুব ই সাধারণ একটা ব্যাপার, তুমি জেনে অবাক হবে যে এটা শতকরা ৭০ ভাগ মানুষের জীবনেই কোন না কোন সময় হয়ে থাকে এবং এটা হবার কোন বয়স নেই” ।
“তাই ? কই আমি তো কারো কাছে কিছু শুনি নি কোন দিন”!
“ সবার যে হবে তা কিন্তু না, এই যে আমার ই তো যখন প্রথম হয়েছে আমার কাছেও বিষয়টা খুব খটকা লেগেছে,একবার মামা দেশের বাড়ি থেকে পিঠা এনেছে, আগেও আনত, কিন্তু সেবার মামা র আস আটা কে মনে হইছিল যেন এ ঘটনা ঠিক আগেও হয়েছে”।
আমি তখন ক্লাস এইটে কি নাইনে পড়ি”
“হুম”, মিম শুনে যাচ্ছে , “এটা কি কোন দুশ্চিন্তা থেকে হয়”?
“না ঠিক তা না, তবে দুশ্চিন্তা বা ধর মেন্টাল স্ট্রেস এটা কে বাড়িয়ে দিতেই পারে , তবে এমন নজির খুব বেশি নয়” ।
তাহলে এর কারণ টা কি ?
আমি বলি, “ শোন, আমরা যা চিন্তা করি বা ভাবি কিংবা যেসব ঘটনা নিয়ে ভাবি তা মস্তিষ্কের প্রধানত দুইটা জায়গার কাজ,মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব যেটা সেটায় থাকে যা নিয়ে তুমি ভবিষ্যতের কিছু নিয়ে চিন্তা কর, টেম্পোরাল লোব কাজ করে অতীতে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা নিয়ে , আর এদের মধ্যবর্তী যে লিম্বিক সিস্টেম তা কাজ করে বর্তমানে কি করছ বা ভাবছ তা নিয়ে । ভেবে দেখ তুমি ঠিক কয়েক মিনিট আগে যা ভেবেছ তা কিন্তু তোমার মস্তিষ্কের জন্য অতীত হয়ে গেছে, বর্তমানে ভাবনা টা তাই খুব ই সামান্য অংশজুড়ে” ।
“হুম”।
আর আমাদের যা চিন্তা কিংবা মস্তিষ্কের একেক জায়গার যা কাজ তার সবই আসলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে একটা ব্যালেন্সড সিগনাল ট্রামস্মিটিং সিস্টেমের মাধ্যমে pass হয় , যখনই এ সিস্টেমের কোন না কোন অংশের সিগনাল ট্রান্সমিটিং এর কোথাও Imbalance ঘটে তখন ই দেখা যায় স্মৃতির কোন না কোন অংশ যেখানে সংরক্ষিত হবার তা না হয়ে অন্য কোথাও জমা হচ্ছে এবং তোমার উপস্থিত চিন্তা নিয়ন্ত্রণ কারী মস্তিষ্কের বর্তমান ঘটনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত কিংবা তোমার অনুভূতি প্রকাশ করবে তাতে একটা ভুল সিগনাল দেয়...”।
“কিন্তু আমি যা দেখছি তা তো ভুল না”
“এক্সাক্টলি, কিন্তু প্রব্লেম হয়েছে, যেটা ভেবেছ সেটা ভুল । আরো শোন, আমাদের এক একটা চোখ সেকেন্ডে প্রায় চল্লিশ টা ডাটা (ইমেজ ডাটা যাকে বলে) তা প্রসেসিং করে মস্তিষ্কে পাঠায়, যদি কোন কারণে, এক চোখের চেয়ে অন্য চোখের পাঠানো ডাটা পৌছাতে বেশি সময় লাগে তবে দেখা যাবে এই ডাটাগুলো নিয়ে মস্তিষ্কের যে অংশ প্রসেসিং করে (Amygdale) সে চোখের রিড করা এই সামান্য ত্রুটি টা ধরতে পারে না যে কারণে আমাদের মনে হয়ে থাকে এই ঘটনা তো আমি আগেই দেখেছি বা আমার পূর্ব পরিচিত” ।
“হুম, বুঝলাম, বেশ অদ্ভুত” ।
তবে ইমেজের টা এভাবে ব্যাখ্যা করা গেলেও Auditory system কিংবা অন্যান্য ইন্দ্রিয় অনুভূতিগুলোর কিন্তু এমন ব্যাখ্যা এখনো পুরোপুরি করতে পারেন নি বিজ্ঞানীরা । তারা অবশ্য বলেছেন এর কারণ Optic, Auditory কিংবা অন্যান্য ইন্দ্রিয় অনুভূতিগুলো সব ই যে ফাংশনের মাধ্যমে,( amygdale function) আমাদের মাথায় থাকে ওখানের সবগুলো অনুভূতি একসাথে একটা স্পেসিফিক ডাটা সিগ্ন্যাল তৈরি করে এবং এরা এক একটা ইউনিট হিসাবে থাকে,এমনও হতে পারে তুমি কারো হাসি দেখেছ শুধু দূর থেকে সেখানে Audio signal তো absence থাকবেই , তো সেই সিগ্নাল গুলো যখন ফাইনালি প্রসেসিং এ একটু ডিজঅর্ডার হয় তখন এমন অনুভূতি হতে পারে” এ””
“ওরে বাবা, বুঝলাম, বুঝলাম...তুমি তো একেবারে আমাকে ক্লাসে যেভাবে পড়াও সেভাবে লেকচার দিচ্ছিলে ...”
হা হা হা , শোন, আরো মজার ব্যাপার হল, Déjà vu র উলটা একটা ঘটনাও কিন্তু ঘটতে পারে,
“মানে”?
“এটা কে বলে Jamais vu, এতে তোমার খুব পরিচিত কোন ঘটনাকেও পুরোপুরি অচেনা কিংবা অনেক জানা কোন বিষয়কেও নিতান্ত অজানা বলে মনে হতে পারে। হাসছ যে ...”
“এটা আমার পরীক্ষায় রেগুলার হত নিশ্চয়ই, আচ্ছা এটা কি শর্ট টার্ম মেমোরি লসের মত কোন কিছু ?”
“উমম, ব্যাপার টা ঠিক এটা না ।আরেকদিন ব্যাখ্যা করব...এখন নিশ্চয়ই ঐ ঘটনা নিয়ে আর কোন দুশ্চিন্তা নেই”?
“না আসলে অল্প কিছুদিন আগেও এমন হয়েছিল কিনা তাই ...”
“হুম, তোমার ক্ষেত্রে আসলে পর পর দুটা Bad Experience দিয়েই Déjà vu টা হয়েছে । এ কারণেই ভয় পেয়ে গেছ হয়ত” ।
“যাহোক, অনেক রাত হল, এবার ঘুমানো উচিত না ?”
“হুম, কিন্তু এখানেই তো ভাল লাগছে কথা বলতে ,আরো কিছুখন বসি না”
“ঠিক আছে,কাল আমার ক্লাস দুপুরে , নো প্রব্লেম ম্যাডাম”
“এবার অন্য কিছু বল, আর প্রফেসারি না প্লিজ”
“হা হা হা”

“মুন্নি যখন বুয়েটের ছাত্রী”

(লেখাটা আমার বন্ধু আশফাকের অনুরোধে লিখছি, অনেকদিন পর লিখা লিখি করলাম... গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক...বাস্তবের সাথে মিলে গেলে তা হবে নিতান্তই কাকতালমাত্র...)

দৃশ্যঃ১

“স্লামালিকুম আঙ্কেল”
“ওয়ালাইকুম সালাম মা, কেমন আছ? বাসার সবাই কেমন আছে?”
“জী ভাল আছে সবাই”
“তুমি জানি এখন কোন ক্লাসে পড়?”
“জী আঙ্কেল আমি এখন বুয়েটে পড়ি, ইইই তে” (যথা সম্ভব পার্ট না নেওয়ার try করলাম)

“আরে বাহ বাহ তুমি বুয়েটে পড়! দেখে তো মনেহয় ইস্কুলে পড়!”
(আমি কি বলব না বুঝে হাসি হাসি মুখ করে রাখলাম)

“আমার এক শালা আছে, বুয়েটের থেকে পাস করে এখন ইউ এস এ তে পিএইচডি করতেছে, বেশ ভাল ইউনিভার্সিটিতে......”
(ধুর এই লিফট এত্ত
slow ক্যান? আমার ক্লাসের Late হইযাচ্ছে তো... শিট... আজকেও এটেন্ডেন্স যাবে... মৌচাকের জ্যাম এই তো এক ঘন্টা যাবে...উফফ আমার ৩০ মার্ক্স যাবে...আমার A+ মিস হইযাবে...শিট... কবে যে আম্রিকা যাব...এই দেশে থাকি কিছু হবে না...)

দৃশ্যঃ

মুন্নির এখন ফেসবুক এ যাইতেই ভাল্লাগে না... গত এক বছর তার স্কুল কলেজের ৮০% বান্ধবীর ই বিয়ে হয়েগেসে... সবাই গাদা গাদা পিক আপ করে... বিয়ার ছবি, হানিমুনের ছবি... জামাইকে নিয়ে রুমান্টিক ছবি, মুন্নি খালি সবগুলাতে “লাইক” মারে... আর কয়েকটা তে কমেণ্ট করে “WOW You look so pretty… the ring looks so nice! Such a sweet couple!” এইসব দেইখা মুন্নির ও ইচ্ছা করে পিক দিতে, লাইক পাইতে... কিন্তু মাত্র তো লেভেল ৩ টার্ম ২ শুরু হইল, এখন কেম্নে বিয়া করবে... মুন্নি নিজেরে বুঝায়... না আমাকে বড় হইতে হবে...আম্রিকা গিয়া রিসার্চ করতে হবে...এখন সময় ক্যারিয়ার গড়ার...

বান্ধবীদের বাচ্চা কাচ্চা স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়ে যায়... মুন্নির লেভেল ৩ টার্ম ২ তখন ও শেষ হয়না...
দৃশ্যঃ

“আবুল ইস মেরিড টূ মর্জিনা”
হায় মুন্নি এটা কি দেখল... হায়... বুকটা তার খান খান হয়ে যায়... যাও আবুল স্যার এর উপর এক্টু
crush খাইছিল... ইতার ও বিয়া হইগেল!! যাহ শালা আর বিয়াই করমু না, মুন্নি ভাবে... এখন সময় জিয়ারি আর টোফেলের...

দৃশ্যঃ
জিয়ারি দিয়ে ফেলছে মুন্নি আম্রিকা যাওয়া আর ঠেকায় কে? রিকমেন্ডেশন লেটার এর জন্য স্যারদের কাছে যায় ও...

“স্যার একটা ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করছিলাম... আপনি যদি এক্তু রিকমেন্ডেশন দিতেন...”
“তুমি তো এখন ও পাস করনাই... এত তাড়াতাড়ি কেন?”

“এই স্যার মানে ৭ টার্মের রেজাল্ট দিয়ে আর কি মানে ইয়ে...”

“আচ্ছা তোমার সিজিপিএ আমাকে মেইল করে দিও”

মুন্নি মেইল করে, স্যার তাও রিকমেন্ড করেনা... এদিকে এপ্লিকেশন সাবমিশনের ডেডলাইন কালকে... মুন্নি আবার স্যার কে ধরে...

“স্যার রিকমেন্ডেশন টা দেন স্যার... আপনি না দিলে আমি অথই পাথারে পড়ব...না খাই মরতে হবে... স্যার একটু কষ্ট করে দিয়ে দেন স্যার...প্লিজ স্যার” (মুন্নির নিজেকে রাস্তায় জ্যাম এ আটকালে যেমন ভিখারিরা ভিক্ষা চায় ওদের মত মনেহয়... কিছুই করার নাই... আম্রিকা যাইতে হইলে এগুলা করতেই হবে... আমার ও একদিন সময় আসবে পার্ট নেওয়ার...মুন্নি ভাবে)

দৃশ্যঃ

মুন্নির আম্মা মহা tension আছেন মেয়েকে নিয়ে... ওর বয়সে উনার দুইটা বাচ্চা হইগেছিল...আর মেয়ের এখনো বিয়া হইল না... মেয়েকে Indirectly জিজ্ঞেস করছিলেন প্রেম করে কিনা... বলে আগে একজন পছন্দ ছিল এখন নাই...না থাকলে তো ভাল কথা... কত ভাল ভাল পিএইচডি ছেলে আসে আম্রিকা থেকে বিয়ে করতে... কিন্তু মেয়ে তো বিয়েই করতে চায় না... উনি অবশ্য মেয়ের বায়োডাটা বানায় ছবি দিছেন কয়েকজন ভাবিকে... বিয়ে বাড়িতে মুন্নিকে এক ছেলের মা দেখে পছন্দ ও করছে... এখন ভালয় ভালয় ছেলের মেয়েকে পছন্দ হইলেই হয়... মেয়েদের বিয়ের একটা বয়স আছে না... বুয়েটে পড়তেছে তো কি হইছে... বিয়ে সংসার তো করতেই হবে... তারপরে জামাই যদি বলে আরো পড়তে পড়বে নইলে যা পড়ছে ওইটাই এনাফ... এত পড়াশুনার দরকার নাই...
মুন্নি কি রকম ছেলে বিয়ে করতে চায় বা আদৌ করতে চায় কি না সেটা আর কেউ জিজ্ঞেস করে না...

দৃশ্যঃ

মুন্নি কেরিয়ার করতে চায়... কিন্তু দুইটা চাকরির ইন্টারভু দিয়া ও তার চাকরি হয় নাই... ভাবে না এই টার্মে ৪ কোপাইতে হবে... আম্রিকা যাইতে হবে...আগে যাই একবার ফেসবুক ঘুরে আসি... ওমা এক্সাম পিছাইছে আবার! এখন পইড়া কি হবে...যাই মুভি দেখি গা...

মুন্নির বান্ধবী শিলা ৫০০০০ টাকার চাকরি করে আবুলেটেলে... হানিমুনে যায় মরিশাসে... মুন্নি মুভি দেখে দেখে ক্যারিয়ারের কথা ভাবে...আর ভাবে... আহ আম্রিকা কত সুন্দর!

রবিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

নূরুল হুদা একদা হিমুকে নিয়ে নাটক বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলো-০১

০১.
হিমুকে নিয়ে কিছু একটা বানানোর শখ আমার বহুদিনের। সেটা হতে পারে নাটক, হতে পারে টেলিছবি---আর ফিল্ম    হলে তো পুরাই অস্থির। এই আজব পোকা আমার মাথায় ঢোকে বুয়েটে ঢোকার মাস ছয়েকের মধ্যে। 'ইবনে বতুতা ইন বুয়েট' শিরোনামের একটি বুয়েট ফিকশন দেখে। তখনো বুয়েটে 'ইলেকট্রিক্যাল ডে' নামের একটি দিবসের অস্তিত্ব ছিল এবং বড় ভাইয়া-আপুরা 'আজ ঈদ। EEE'র ঘরে ঘরে আনন্দ' উপলক্ষে এইরকম 'না নাটক না টেলিছবি' বানানোর উদ্যোগ নিতেন।

পাঠক বুঝতেই পারছেন, আমার তখন ফার্স্ট ইয়ার চলে। যা দেখি, তাই ভালো লাগে। তো এই ভিডিও ফিকশনটাও আমার ভালো লেগে যায়। ইইই '০৩ ভাইয়াদের নির্মাণ এটি। বুয়েটে নির্মিত নাটকগুলির একটি কমন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে বুয়েট স্টুডেন্টদের দৈনন্দিন ঘটনাবলীই একটু কমিক ওয়েতে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। সুনির্দিষ্ট কোন গল্প দেখানোর চাইতে ইমেজ দেখানোই এগুলোতে মুখ্য হয়ে ওঠে। এই নাটকটিও সেই চিরায়ত বৈশিষ্ট্য ধারণ করে চলেছে। অনেকদিন পর যখন এগুলো দ্বিতীয়বার দেখতে বসি, ভেবে অবাক হই, ১-১ এ থাকতে এগুলো কীভাবে ভালো লেগেছিলো!

যাহোক, ইবনে বতুতা ইন বুয়েট দেখে আমারো দুটো নাটক বানানোর সাধ হয়-'জেমস বন্ড ইন বুয়েট' আর 'হিমু ইন বুয়েট'। বলা বাহুল্য,দুটোই আমার খুব ফেভারিট ক্যারেক্টার। চরিত্রগত দিক দিয়ে এরা দু'জন যদিও দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। একজন চরম সক্রিয় পাবলিক, আরেকজন ভয়াবহ অক্রিয়। স্টোরিলাইন নিয়ে তখন খুব একটা মাথা ঘামাইনি। বা বলা যায়, ইবনে বতুতার স্টোরিটেলিংটাই তখনকার জন্য মাথার ভেতর আসন গেড়ে বসে। স্টোরিটা খুব সংক্ষেপে এরকম---হঠাৎ করেই কোন এক শুভ সকালে জেমস বন্ড বা হিমুর বুয়েটে আগমন ঘটবে এবং ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া ঘটনাচক্রের সাথে তারা জড়িয়ে পড়বে। অথবা দূর থেকে তারা ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে যাবে এবং সময়ে-অসময়ে দু-একটা ছোটখাটো ঘটনা ঘটিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জাহির করার চেষ্টা করবে।

দুর্বল স্টোরিটেলিং। কী করবো, বলুন? আমাদের পূর্বসূরীরা আমাদের জন্য যা রেখে যান, আমরা তো তাকে একেবারে অস্বীকার করে সামনে এগোতে পারি না।


০২.
হিমুকে নিয়ে আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় যে নাটক বা টেলিছবি হয়নি---এমনটা নয়। আমার স্ম্‌তি যদি আমার সাথে প্রতারণা না করে (যেটা কিনা হরহামেশাই ঘটে) তাহলে, আসাদুজ্জামান নূর সম্ভবত কোন এক কালে হিমুর চরিত্রটি করেছিলেন। বাদল ছিল জাহিদ হাসান বা অন্য কেউ। পাঠককে আমার দাবির উপর কড়া আস্থা রাখতে হবে, এমনটা বলছি না। আমার ভুলও হতে পারে। এমনও হতে পারে, নূর সাহেব উচ্ছন্নে যাওয়া কোন ভবঘুরের চরিত্রে রূপ দিয়েছিলেন, এতোদিন পর সেই নাটকের ইমেজ আমার সামনে হিমুর রূপ নিয়ে দেখা দিয়েছে।

তবে যে যাই বলুন, হিমুর চরিত্রে নূর সাহেব আমার মাথায় মোটামুটি স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছেন। নো নড়ন চড়ন।

বছর খানেক আগে রেদওয়ান রনি হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন ক্যারেক্টারকে পুঁজি করে পাঁচ পর্বের একখানা ধারাবাহিক নামিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিক দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কোনোটাই আমার হয়নি। ঈদ উপলক্ষে নির্মিত এই ধারাবাহিকের আকর্ষণ ছিল বাকের ভাই, বড় চাচা আর হিমুর মত জনপ্রিয় সব ক্যারেক্টার।

রেদওয়ান রনির উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট। হুমায়ূন আহমেদের এই কালজয়ী চরিত্রগুলোর জনপ্রিয়তাকে বিনিয়োগ করে ঈদ নাটক চালানোর ধান্দা। সিম্পল এ্যান্ড স্ট্রেট বিজনেস পলিসি। উনার উদ্দেশ্য আপাতদ্‌ষ্টিতে সফল হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়। ধারাবাহিকটি সেসময় ভালোই প্রচার পেয়েছিলো। কেউ কেউ দেখেছেনও নিশ্চয়ই।

আমি দেখিনি। কারণ? না, রেদওয়ান রনির প্রতি কোন বীতশ্রদ্ধা থেকে নয়। হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে, তার ফ্যামিলিকে ব্র্যান্ডিং করে বইয়ের কাটতি বাড়ান। রেদওয়ান রনি নাহয় তাঁকে বিক্রি করেই নিজের নাটকের বিক্রিবাট্টা বাড়ালো। তাহলে? দেখিনি, কারণ এইখানে হিমুর চরিত্রে রূপদান করেছেন ভাই-বেরাদর কিসিমের নাটকের প্রবাদপুরুষ মুশাররফ করিম। উনার অভিনয় প্রতিভা নিয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই। কিন্তু, হিমু চরিত্রে উনাকে কল্পনা করতে আমার বেশ কষ্টই হয়। এজন্য দায়ী অবশ্যই এবং অবশ্যই আসাদুজ্জামান নূর। উনি যদি কোনকালে 'হিমু' নাও করে থাকেন, তবু কীভাবে কীভাবে যেন হিমু বলতেই আমার মনে উনার ইমেজটা ভেসে ওঠে। জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাতে উনি শহর জুড়ে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, ভাবতেই ভালো লাগে।

০৩.
হিমুকে নিয়ে কেবল হুমায়ূন আহমেদই লেখেন, এমনটা নয়। হিমুর যারা ভক্তমুরীদ আছেন এবং সামান্য লেখালেখির ক্ষমতা আছে, তারা আধ ঘণ্টার নোটিশে একখানা হিমু-ব্লগ নামিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন। হুমায়ূন আহমেদের লেখার ঢং ফলো করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। আর হিমু তো নির্দিষ্ট কিছু ব্‌ত্তে নিজেকে আবদ্ধ রাখে। মাজেদা খালার সাথে দেখা হবার মধ্য দিয়ে গল্পের পর্দা খোলে, শেষ হয় জ্যোৎস্নারাতে হাঁটাহাঁটির মধ্য দিয়ে। মাঝখানে পুলিশের সাথে একবার মোলাকাত আর রুপা কিংবা রুপার বাবার সাথে একটা সেমি-লং সিকোয়েন্স বাতচিৎ হলেই হল। ব্লগে তাই হুমায়ূনের ছায়া-উপছায়াদের সাক্ষাৎ পাওয়া খুব দুর্লভ ঘটনা নয়।

সামহোয়ারে এই কালচারের শুরু। এই কালচার ভালো কি মন্দ সে দেখভালের দায়িত্ব ব্লগের পাঠকদের। এই জাতীয় পোস্ট বেশি হিট খায় বলেই ব্লগাররা এ ধরণের লেখা লিখতে উৎসাহিত বোধ করেন। একই কথা খাটে 'ছুটি' বা 'হৈমন্তী' গল্পের আধুনিক সংস্করণের ক্ষেত্রেও। রম্য পোস্ট হিসেবে এগুলো পড়তে মন্দ লাগে না। কিন্তু ছুটি বা হৈমন্তীর ক্ষেত্রে লেখকেরা তাদের ব্যক্তিগত ক্যারিকেচার খাটান। অনেকটা 'অমুক' ফিচারিং রবীন্দ্রনাথ টাইপের লেখা হয় এগুলো। বিশ শতকের হৈমন্তী অবলীলায় একুশ শতকের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দাপিয়ে বেড়ান, ফটিকের স্থান হয় কোন এক ইংরিজি মাধ্যম স্কুলের লাস্ট বেঞ্চিতে।

হিমুর ক্ষেত্রে লেখকদের এই ক্যারিকেচার কোথায় যায়, ঈশ্বর মালুম। তারা হুমায়ূন আহমেদের হিমুকে নিজেদের স্থান-কালে নিয়ে এসে হুমায়ূন আহমেদের গল্পই পরিবেশন করেন শেষমেশ। কোথাও কোন নতুনত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না এইসব লেখায়। সুতরাং, হা-হতোস্মি করা ছাড়া পাঠকের আর কিছুই করার থাকে না।

০৪.
হিমু সংক্রান্ত আমার এই হাপিত্যেশ অনেকাংশেই দূর হয় বন্ধু সনেটের এই লেখাটা পড়ে। এই লেখায় সে হিমুর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সম্পূর্ণ নতুন একটা প্লটা দাঁড় করানো চেষ্টা করেছে।

সেসময় তেল-গ্যাস আন্দোলনের একটা জোয়ার চলছিলো আমাদের মধ্যে। পাঠক লেখাটার মধ্যে তার খানিকটা আভাস পাবেন বোধোয়। সিরিজটা আর এগোয়নি। লেখকের ইচ্ছা ছিল, হিমুর আপাতদ্‌ষ্টিতে উদ্ভট ও অর্থহীন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তেল-গ্যাস আন্দোলনের দিকে বন্ধু ও পাঠকসমাজের দ্‌ষ্টি আকর্ষণ করা। সিরিজটা এগোলে হয়তো তার সফলতাও মিলতো।

যাহোক, লেখাটা পড়ার পরপরই ঠিক এই প্লটে দাঁড়িয়েই আমার একটা নাটক/টেলিছবি বানানোর ইচ্ছা চাগিয়ে ওঠে।

সনেটকে আমি আমার ইচ্ছের কথা বলি। দেখি, সনেটও এক পায়ে খাড়া। ঠিক হয়, ও ওর মত লিখে যাবে। আমি পরে স্ক্রিপ্ট লেখার সময় যোগ-বিয়োগ করে ফাইনাল ভার্সন দাঁড় করাবো। এবং গল্পটা হবে একদম নতুন। হিমুর ফ্লেভার আনার জন্য হু.আ.র যতোটুকু সাহায্য নেয়া প্রয়োজন, আমরা তাই নেব। এক চুলও বেশি নেয়া চৈলত ন চৈলত ন।

বৃহস্পতিবার, ২৬ জানুয়ারী, ২০১২

Not one less---বাদ যাবে না কোন শিশু

গতকাল চ্যানেল আই-তে একটা গোলটেবিল বৈঠক দেখছিলাম। টিভিতে খেলা আর পুরানো মুভি ছাড়া আমার তেমন কিছুই দেখা হয় না।  এ ধরণের গোলটেবিল বৈঠক, টক শো আমার দেখার কথা না। তারপরও আগ্রহভরে অনুষ্ঠানটা দেখছিলাম। আমি ও আমার দুই ছোট ভাই। কেননা, অনুষ্ঠানটা ছিল আমাদের মত স্টূডেন্টদের নিয়ে। শিক্ষাখাতের বিভিন্ন সমস্যার কথা খোদ ছাত্র ও অভিভাবকদের কাছ থেকে শুনছিলেন স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী। তো কথায় কথায় উঠে আসে বেসরকারী স্কুলগুলোতে অত্যধিক ভর্তি ফি'র প্রসঙ্গটি। খুলনার এক বালক দুঃখ করে বলছিলো, তার খুব শখ ছিল ওখানকার সেন্ট জোসেফে ভর্তি হবার। ভর্তি ফি কত? মাত্র ২৩০০ টাকা। শুনে আমরা তিন ভাই তো হেসেই গড়াগড়ি। ঢাকায় যেখানে বেসরকারী স্কুলগুলোতে ১০-১২-১৫ হাজার টাকা দিয়েও মানুষ ভর্তি হচ্ছে (শুনেছি মণিপুর স্কুলের ভর্তি ফি ২৫ হাজার টাকা, সত্যি মিথ্যা জানি না), সেখানে ২৩০০টাকার জন্য একটা ছেলে ভালো স্কুলে ভর্তি হতে পারছেন, শুনলে একটু অবাক হই বৈকি। ঢাকায় জীবনযাত্রার মান যথেষ্ট ব্যয়বহুল, এই্ যুক্তিকে গোণায় ধরেও সম্পদের এই বৈষম্যকে স্বীকার করতে চায় না আমার বুর্জোয়া মন।

ঐ সভাটির ঠিক একদিন পরই একটা মুভি দেখে প্রবল ঝাঁকুনি খেলাম আমি। দুঃখের বিষয়, মুভিটির নির্মাতা কোন বাংলাদেশি নন। Yimou Zhang (সঠিক উচ্চারণটা কি হবে, কেউ বলতে পারবেন, প্লিজ?) নামের একজন অজানা অচেনা চাইনিজ ফিল্মমেকার। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইনারই House of the dragon flies নামের মুভিটি আমি আগেই দেখেছি। আমি চাইনিজ (সামুরাই/সোর্ড) ফিল্মের ভক্ত নই। আমার ভাইদের জোরাজুরিতে এই ধরণের ফিল্মগুলো দেখা হয় আরকি। ওরা এই জেনারের ফিল গোগ্রাসে গেলে এবং আমাকেও গিলতে বাধ্য করে। তবে আর দশটা চাইনিজ এপিক এ্যাকশন মুভির সাথে এই মুভিটির পার্থক্য হচ্ছে, এখানে কালারের ব্যবহার। Yimou Zhang কে বলা হয় ওখানকার 'মাস্টার অফ কালার'।  House of the dragon flies আপনার যেমনই লাগুক, এর রঙের ব্যবহার যে আপনার দ্‌ষ্টি কাড়বেই, একথা নির্দ্বিধায় বলে রাখতে পারি।

যাহোক, আজ আমি House of the dragon flies নিয়ে কথা বলতে আসিনি। এসেছি Not one less নামের স্বপ্ন ও বাস্তবতার মাঝামাঝি একটি অনন্যসাধারণ মুভির গল্প করতে। ট্র্যাকচ্যুত হবার জন্য পাঠকের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।

এককালে বলতাম, হলিউড-বলিউডের পাশাপাশি এই ভিন্নভাষী মুভিগুলো এক পশলা ব্‌ষ্টির মত। এখন এই ভিন্নভাষী মুভিগুলোই হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার 'পিএল হোম ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল' এর প্রধান আকর্ষণে।

Not one less আসলে কী টাইপ মুভি? সোজা কথায়, এটি একটি ডকু ফিকশন বা নিও-রিয়েলিস্টিক ঘরানার ফিল্ম। আরো অনেক নিও রিয়েলিস্টিক ফিল্মমেকারের মত    Yimou Zhangও আব্বাস কিয়োরোস্তোমির দ্বারা অনুপ্রাণিত। একথা তিনি খোলাখুলি স্বীকার করতেও দ্বিধা করেননি। এ ধরণের প্রায় ফিল্মেই যেমনটা থাকে, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা প্রথমবারের মত ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান এবং বাস্তব জীবনে তার যে ভূমিকা, অনেকটা সেই নাম ও ভূমিকাতেই অভিনয় করেন---এই ফিল্মেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নিও-রিয়েলিস্টিক মুভির সাথে পরিচয় নেই, এমন দর্শকের হঠাৎ করে মনে হতে পারে, নির্মাতা বুঝি খুব একটা যত্ন নিয়ে বানাননি মুভিটি। চরিত্রগুলোর বিশেষ বিশেষ মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দী করে অসংখ্য ফুটেজের কালেকশান থেকে কেটেছেঁটে একটা মুভি দাঁড় করিয়েছেন আরকি। আপনি যদি এ ধরণের মুভির দর্শক হিসেবে নতুন হন এবং এগজ্যাক্টলি এই অনুভূতিটির সম্মুখীন হন, বুঝতে হবে নির্মাতা তার কাজের ক্ষেত্রে শতভাগ সফল। (আমাদের সরওয়ার ফারুকী নিজেকে কিয়োরোস্তোমির শিষ্য দাবি করেন, যদিও তার কোন মুভিতে আমি নিও-রিয়েলিজমের গন্ধমাত্র পাইনি)

এই রে, বকর বকর করেই যাচ্ছি। এদিকে প্লটটা পর্যন্ত এখনো বলা হল না পাঠককে।

চীনের খুব সাধারণ একটি গ্রাম। গ্রামের একটি প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করেন এক বোকাভোলা ব্‌দ্ধ। ছ'মাসের বেতন আটকে আছে তার। শুধুমাত্র শিক্ষার প্রতি ভালোবাসার কারণেই গ্রামের বিচ্ছু পোলাপানকে মানুষ করার সুকঠিন দায়িত্ব হাসিমুখে পালন করে চলেছেন তিনি। জরুরী কাজে তাকে শহর যেতে হবে। তাও আবার এক মাসের সফর। এই সময়টা তার ছাত্রবাহিনীকে সামলাবে কে? এইখানেই আমাদের নায়িকার আবির্ভাব। তের বছরের এক কিশোরীর উপর এই 'ওয়ান ম্যান বেইজড' স্কুলটির দায়িত্ব অর্পিত হয়। কিশোরীর কোন প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষা নেই। নেই পড়ানোর অভিজ্ঞতাও। এদিকে দারিদ্র্যের মুঠোয় বন্দী স্কুলের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই শহরে পাড়ি জমাচ্ছে জীবিকার আশায়। ব্‌দ্ধ শিক্ষকের ডেডিকেশনও কোন কাজে আসছে না। ব্‌দ্ধ সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত কিশোরীকে তাই যাবার আগে পইপই করে বলে গেলেন,যে ক'জন শিক্ষার্থী  তিনি রেখে যাচ্ছেন, ফিরে এসে যেন সব্বাইকে দেখতে পান। একজনও যেন বাদ না যায়। Not one less.

কিশোরী কি পারবে তার দিকে ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জের মোক্ষম জবাব দিতে? পারবে তাকে গুণে গুণে দেয়া ৩০টা চক দিয়ে এক মাসের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে?

এর উত্তর আমি দেব না। মুভিটি নিজেই এর জ্বলজ্যান্ত জবাব।

এই মুভিটির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর চরিত্রগুলোর সিমপ্লিসিটি। স্কুলের বাচ্চাগুলো থেকে শুরু করে তের বছরের ম্যাডাম---সবাই এক অদ্ভূত সরলতার আদলে গড়া। দেখে মনে হবে, এরা যেন এই প্‌থিবীর কেউ নয়। স্বর্গ থেকে নেমে আসা এক একটা আশ্চর্য প্রতিমা, যারা আধুনিক প্‌থিবীর সকল কর্পোরেট জটিলতা থেকে মুক্ত। জটিল প্‌থিবীর কুটিল নিয়ম-কানুন থেকে সুদূর বিচ্ছিন্ন এই মানুষগুলো কীভাবে কীভাবে যেন তাদের সততা ও সরলতার পুরস্কারও পেয়ে যায় ঠিক ঠিক। দেখে বড্ড ভালো লাগে।

আরেকটা ব্যাপার না বললেই নয়। মুভিটাকে আমার সিস্টেমের বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ মনে হয়েছে। খুব সহজ, সাধারন গল্প দিয়েও যে সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল হওয়া যায়, এই মুভিটি তার প্রমাণ। লেখার শুরুতে যা বলছিলাম, গ্রাম ও শহরের শিক্ষাব্যবস্থায় যে পাহাড়সমান বৈষম্য কাজ করছে, এবং সরকার ও সিস্টেম যে এই বৈষম্যকে নীরবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে---এই মুভিটি এই নীরব উপেক্ষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। নব্বই দশকের চীনা পরিপ্রেক্ষিতে নির্মিত হলেও আজকের বাংলাদেশে মুভিটির প্রাসঙ্গিকতা আমাকে বিস্মিত করে।

পত্রিকায় প্রায়ই চোখে পড়ে---অমুক লোক তমুক গ্রামে একাই একটা স্কুল চালিয়ে নিচ্ছেন। ছেলেপেলেরা খোলা আকাশের নিচে যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ শিখছে। পত্রিকার ভেতরের পাতায়, বিশেষত দেশের খবরে এই স্কুল পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের বড় করে গ্রুপ ছবি ছাপা হয়। আমার বুর্জোয়া হ্‌দয় ছবিগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায়। এই ছবিগুলোর মুখোমুখি হবার সামর্থ্য আমার নেই। বাংলাদেশে এরকম কয়টি স্কুল আছে, যা কোন একজন বোকাসোকা মানুষ একাই চালিয়ে নিচ্ছে, আমার জানা নেই। জানা থাকলেও তাদের জন্য কিছু করতে পারতাম কিনা জানি না। নিজের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করতাম নিশ্চয়ই।

আপাতত, বিত্তবান মানুষদের অনুরোধ করতে পারি, আপনার চেনাজানা এমন কোন স্কুল থাকলে তাতে সাহায্য করতে কার্পণ্য করবেন না প্লিজ। আর একটা শিশুও যেন দারিদ্র্যের কারণে 'ঝরে-পড়া' শিশুর দলে নাম না লেখায়। not even one.

আর বাংলাদেশের ফিল্মমেকারদের অনুরোধ করবো, এই মুভির থিমের উপরই একটা মুভি বানিয়ে ফেলুন না। না হোক মৌলিক। মৌলিক কিছুই বানাতে হবে, এমন দিব্যি আপনাদের কে কবে দিয়েছে?  স্করসিজ তো কোরিয়ান মুভির অনুসরণে (লক্ষ্য করুন, আমি কিন্তু 'অনুসরণে' বলছি, 'অনুকরণে' নয়) 'ডিপার্টেড' বানিয়ে অস্কারই জিতে নিলেন। মানছি, অস্কার তার প্রাপ্য ছিল, 'ডিপার্টেড' ছিল একটা উছিলা মাত্র। এদিকে পাশের দেশের রামগোপাল 'Godfather' এর অনুসরণে 'সরকার' বানালেন, কিন্তু মুভির মধ্যে নিজের ছাপটা ঠিকই রেখে যেতে পেরেছেন।

সাহস ও সততা থাকলে খুব অল্প পুঁজিতেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এরকম কিংবা এর চেয়েও উঁচুমানের একটা মুভি নির্মাণ সম্ভব।

আপনারা নির্মাণে এগিয়ে আসুন।
আমরা দল বেঁধে দেখতে আসবো, কথা দিচ্ছি।

রবিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০১২

বিহাইন্ড দ্যা সিন অফ 'Cloud No. '06': হিমু বিষয়ক আবজাব

হিমু ক্যারেক্টারটার প্রতি আমার এক ধরণের অবসেশান আছে। অতি অবশ্যই এই অবসেশান এক দিনে তৈরি হয়নি। আরো অনেকের মতই আমারো এক সময় হিমুর প্রতি এক ধরণের অবজ্ঞার ভাব ছিল। বলতে দ্বিধা নেই, হিমু নিয়ে বন্ধুবান্ধবদের বাড়াবাড়ি দেখেও সামান্য বিরক্ত হতাম। একটা বোগাস ক্যারেক্টার যে কিনা সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, উল্টোপাল্টা ভবিষ্যৎবাণী করে বেড়ায় এবং কাকতালীয়ভাবে সেগুলো লেগেও যায়---তাকে নিয়ে এতো বাড়াবাড়ির কোন মানে দেখতাম না আমি।

আমার বন্ধু শাহান ছিল হিমুর বিরাট ফ্যান। অলস বিরক্তিকর ক্লাসগুলোতে হিমুর বই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। পড়ার বইয়ের বাইরে বিশেষ কিছু পড়া হয় না। এর মধ্যে শুরু হল ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনা। ২০০২ সালের বিশ্বকাপের কথা বলছি। খেলাগুলো সব পড়েছে বাংলাদেশ সময় দিনের বেলায়। স্বভাবতই ক্লাসে উপস্থিতির হার আশংকাজনকভাবে কমে গেছে। সেই দুর্ভিক্ষের সময়ও শাহান কোন ক্লাস মিস দিয়েছিল বলে মনে পড়ে না।

ক্লাসে খালি আসি-যাই। স্যারদেরও পড়ানোর চেয়ে টিফিন পিরিয়ডে আমাদের নিয়ে খেলা দেখায় আগ্রহ বেশি। পড়াশোনার চাপ নেই। কী করি, কী করি ভাবতে ভাবতে একদিন শাহানের কাছ থেকে হিমু সমগ্রটা চেয়ে নিলাম। শাহান তো এই বই নিয়ে ব্যাপক উচ্ছ্বসিত। ওর ধারণা, আমি এই বই পড়ে ভয়াবহ মজা পাব। হাসতে হাসতে পেটে ও পিঠে খিল ধরে যাওয়াও বিচিত্র নয়।

শাহানের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে এই বইটি আমার একদমই ভালো লাগেনি। হিমুকে নিয়ে লেখা প্রথম চারটি উপন্যাস (নাকি অপন্যাস) এর সংকলন ছিল এটি। মজা তো পাইইনি, উলটো হিমুকে নিয়ে আমার যে প্রিএ্যাজামশনগুলো ছিল, সেগুলো আরো পোক্ত হল। ময়ূরাক্ষী দিয়ে শুরু, দরজার ওপাশে দিয়ে শেষ। এর মধ্যে ছিল 'হিমু' নামের একটি গল্প, আরেকটার নাম এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না।

তবে একটা ব্যাপার ঘটলো, হিমু চরিত্রটার প্রতি আমি এক ধরণের মমতা অনুভব করা শুরু করি। বাদল, রুপা, ফুফু---এই চরিত্রগুলোও খুব আপন মনে হতে থাকে। হুমায়ূন আহমেদের সাফল্য সম্ভবত এখানেই। হুমায়ূন পরম মমতা দিয়ে এক একটি চরিত্র বিনির্মাণ করেন, কিন্তু গল্পগুলো সেই পরিমাণ যত্ন ও ধৈর্য নিয়ে লেখেন না। হুমায়ূনের এক একটা চরিত্র মনের ভেতর ঠিক ঠিক গেঁথে যায়, কিন্তু চরিত্রগুলো যে গল্প থেকে উঠে এসেছে, সেই গল্পই দ্বিতীয়বার পাঠ করার জন্য কোন তাগাদা তৈরি হয় না। এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। পাঠকের দ্বিমত বা বহুমত থাকা খুব স্বাভাবিক।

লেখার শুরুতেই আমি বলেছি, "হিমু ক্যারেক্টারটার প্রতি আমার এক ধরণের অবসেশান আছে। " এই ক্ষেত্রে পাঠক আমার কাছে এই স্টেটমেন্টের একটা ব্যাখ্যা দাবি করতেই পারেন। পাঠককে হতাশ করে বলতে হচ্ছে, এর কোন ব্যাখ্যা আমি দেব না। হিমুদের কাজ স্টেটমেন্ট দেয়া, সেটা ডিফেন্ড করা না।

তো যা বলছিলাম, হিমুসমগ্র পড়ে আমি বেশ হতাশ হই। হুমায়ূনের অন্যান্য লেখার তুলনায় এগুলো বেশ অগোছালো আর নিম্নমানের মনে হয়। এই ধারণা আমার এখনো বলবৎ আছে। তারপরও কোন এক অব্যাখ্যাত কারণে আমি হিমুর আরো বই পড়তে থাকি। এবং হিমুর জগৎটা আমার এক সময় ভালো লেগে যায়। হিমুর সব বইয়ের শেষেই এক ধরণের 'ফিল গুড' ভাব তৈরি করা হয় বাজার কাটতির উদ্দেশ্যে, একই দ্‌শ্যকল্প বার বার ঘুরেফিরে আসছে (যেমন হিমুর গল্পে পুলিশের সাথে একটা বাতচিৎ থাকবেই), রুপা কোন আধুনিক মেয়ের প্রতিবিম্ব হতে পারে না---এইসব শত সহস্র অভিযোগের পরও হিমুর গল্পগুলো আমি গোগ্রাসে গিলতে থাকি। গল্পের আকর্ষণে নয়, ঐ অব্যাখ্যায় জগৎটার আকর্ষণে।

হিমুকে নিয়ে কি ভাল গল্প তৈরি করা সম্ভব---এই প্রশ্নটা মাঝে মাঝেই আমাকে বিস্তর ঝামেলায় ফেলে দেয়। আমার ভেতর তখন দুই পক্ষের বাদানুবাদ চলতে থাকে। এক পক্ষের যুক্তি---এই হিমু ক্যারেক্টারটাই যদি হুমায়ূন আহমেদের ক্রিয়েশন না হয়ে অন্য কারো হত, এই ধরা যাক চেতন ভগৎ কিংবা শীর্ষেন্দু---তাঁরা হয়তো হিমুকে নিয়ে আরেকটু গভীরভাবে চিন্তা করতেন। হিমুর এক একটা গল্প তখন সমাজের এক একটা অসংগতি নির্মোহ ভঙ্গিতে তুলে ধরতো। আরেক পক্ষ বলে, ধুর মিয়া, তাইলে আর হিমুর হিমুত্ব থাকলো কোথায়? হিমুর এই যে অগোছালো একটা জগত, অনির্দিষ্ট সব কাহিনী---এইতো হিমুর বিশেষত্ব। ওভাবে লিখলে তো হিমু আর হিমু থাকতো না, সমাজসেবক মুন্নাভাই হয়ে যেতো। হিমু নিশ্চয়ই দেশ উদ্ধারের ব্রত নিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশ করেনি। হিমুকে হিমুর মতই থাকতে দে না বাপু।

সবকিছুরই একটা স্যাচুরেশন লিমিট আছে। হিমুর প্রতি আমার স্যাচুরেশন তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষেই। খুব সচেতনভাবে এমনটা ঘটেছে, তা কিন্তু নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে আমি এমন কোন পণ করিনি যে, বড় হয়েছি, বুড়ো হচ্ছি, অতএব হে হিমু বিদায়। সে বছর সম্ভবত "হলুদ হিমু কালো র‍্যাব" নামে হিমুর একটা বই বেরোয়। র‍্যাবের ক্রসফায়ার তখন সময়ের আলোচিত ইস্যু। স্বভাবতই, ব্যাপক বাজার কাটতি পায় বইটি। পত্রিকায় এই লেখার সমালোচনাও বেরোয়। হুমম, এতোদিনে হুমায়ূন একটা কাজের কাজ করেছেন। আশেপাশে কী ঘটছে না ঘটছে, তার উপর হিমুর নজর পড়লো বলে। আশ্চর্যের ব্যাপার এই, হিমুর এই সমাজসচেতনতা উল্টো আমাকে বিকর্ষণ করে। ঐ যে বললাম, হিমু থাকবে হিমুর মত। আশেপাশের প্রতিটি ঘটনাই সে সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করবে, কিন্তু স্পেসিফিক কোন ঘটনা নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। তা সে র‍্যাবের ক্রসফায়ারই হোক আর র‍্যাপ গানের সংক্রামক ব্যাধির মত ছড়িয়ে পড়াই হোক।

প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ তখন সাম্প্রতিক ঘটনাকে পুঁজি করে হিমুর বিক্রি বাড়ানোর নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন। এবং হিমুও প্রতি বইমেলাতেই নিজেই নিজের রেকর্ড ভেঙে চলেছে। আমি তদ্দিনে হিমুর লেখার প্রতি সম্পূর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি। তারপরও প্রতিবারই বইমেলায় ছোট ভাইদের চাপাচাপিতে হুমায়ূন আহমেদের একটা বই কেনা লাগে এবং কাকতালীয়ভাবে সেটা হিমুর বইই হয়। আমার ভাইরা হয়তো বইটি পড়ে কিংবা পড়ে না। কিন্তু আমার আর বইটি স্পর্শ করা হয়ে ওঠে না। শেলফের এক কোনায় প্রতিবারই হিমুর এক একটা বই বেশ অভিজাত লুক নিয়ে জাঁকিয়ে বসে। প্রিয় লেখকের প্রতি রাগ তৈরি হবে ভেবে আমি আর বইগুলোর ছায়াও মাড়াই না। বাস্তবের প্রবল ঘর্ষণে হিমুর জগৎটা আমার কাছে আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হতে থাকে। হিমুর জন্য ভালবাসা---নাহ, সেটা মরে না।

(পাঠক সম্ভবত শিরোনামের সাথে এই হিমু বিষয়ক আবজাবের কোন সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছে না। বিজ্ঞ পাঠককে আমি সামান্য ধৈর্য ধরতে বলবো। সামনের পর্বগুলোতে বিষয়টা পরিষ্কার হবে আশা করছি)